ইসলামী বীমা তাকাফুল পরিচিতঃ
বীমা হল দুই পক্ষের মধ্যে এমন একটি চুক্তি যা দ্বারা একপক্ষ (বীমা কোম্পানি) একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গ্রহণ করার পরিবর্তে মেয়াদের পূর্বে কোন ঘটনা ঘটা সাপেক্ষে অথবা নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে অন্য পক্ষকে (বীমা গ্রাহক) একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করার অঙ্গীকার (A purchase of Security against retain risk) করে।
বীমা আরবীতে তাকাফুল-যার অর্থ হচ্ছে সংযোগস্থল, গ্যারান্টি, দায়িত্বভার গ্রহণ করা, দাবী আদায়ের ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির সাথে অন্য ব্যক্তিকে একত্রিত করার নাম তাকাফুল।
বীমার ইসলামী প্রতিশব্দ তাকাফুল। যার শাব্দিক অর্থ -যৌথ জামিন, পারষ্পরিক দায়িত্বভার গ্রহন ইত্যাদি। পরিভাষায়- তাকাফুল অর্থ হচ্ছে এমন একটি প্রকল্প ব্যবস্থা যা ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও পারষপরিক সহযোগিতা চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত, যেখানে দুর্ঘটনা বা অন্য কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্থ অংশগ্রহনকারী/সদস্যদর মাঝে আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের যৌথ নিশ্চয়তার ব্যবস্থা থাকবে। আর সাম্ভাব্য ক্ষতিপূরণের জন্য সদস্যগণের সকলে মিলে একটি পরিকল্পনা মাফিক সুনির্দিষ্ট হারে চাঁদা/দান প্রদান করে ফান্ড গঠন করবে।
কোরআনুল কারীমে বীমার ভিত্তি:
১. ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক হিসেবে ঘোষণাঃ নিঃসন্দেহে মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই- (সূরা হুজুরাত: ১০)
২. পারস্পরিক কল্যাণমূলক কাজে সহযোগিতা প্রদান : তোমরা পারস্পরিক কল্যাণ ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা কর আর তোমরা একে অপরকে পাপাচার ও সীমালংঘনমূলক কাজে সহযোগিতা করো না। (সূরা আল-মায়িদাহ : ০২)
৩.ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্ততি গ্রহণ অর্থে : হে মুমিনগণ! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো। (সূরা-আল-নেসা: ৭১)
৪. দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য ফসল সঞ্চয় করে আগাম প্র¯দতি গ্রহণ করা অর্থেঃ –তিনি (ইউসুফ আ:) বললেন তোমরা সাত বছর μমাগত চাষাবাদ করবে। অতঃপর তোমরা যে শস্য কর্তন করবে তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ ভক্ষণ করবে বা ব্যতীত সমস্ত ফসল শীষ সহকারে রেখে দিবে। এরপর আসবে সাতটি কঠিন বছর। এই সাত বছর তোমরা পূর্বে যে সঞ্চয় করে রাখবে সেই সংরক্ষিত ফসল হতে সামান্য কিছু খাবে। – (সূরা : ইউসূফ : ৪৭-৪৮)
৫. ভবিষ্যৎ বংশধরদের আর্থিক নিশ্চিতকরণ অর্থে- আর যারা নিজেদের পশ্চাতে নিজেদের অসমর্থ সন্তানদেরকে ছেড়ে যাবে তাদের উপর যে ভীতি আসবে তার জন্য তাদের শংকিত হওয়া উচিত। – (সূরা আন-নিসা : ৯)
হাদীছুন নব্বীতে বীমার ভিত্তি-
১.ঝুঁকি সংক্রান্ত আর্থিক বোঝা নিরসনে সহায়তা :
যে ব্যক্তি কোন মুমিনের জাগতিক কষ্ট দূর করে দেবে আল্লাহপাক শেষ বিচারের দিন তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কারো একটি অভাব মোচন করে দেবে আল্লাহপাক তার ইহকাল ও পরকালের অভাব দূর করে দিবেন। (আবু দাউদ: ৪৪৩৮)
২. বীমা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা স্বরূপ : তোমরা তোমাদের সন্তান-সন্ততিদেরকে দরিদ্র ও কারো কাছে সাহায্য প্রার্থী না করে সম্পদশালী হিসেবে রেখে যাওয়া অনেক ভাল। (বুখারী শরীফ:২৭৪২)
৩. দরিদ্র ব্যক্তিদের তত্ত্বাবধান ও সাহায্য করা আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো: যে ব্যক্তি বিধবা ও দরিদ্র (নির্ভরশীল) ব্যক্তির তত্ত্বাবধান ও সাহায্য করে, সে যেন আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মত কিংবা সেই ব্যক্তির মত যে দিনের বেলা রোজা রাখে ও সারারাত নামাজ পড়ে। (বুখারী শরীফ: ৫৩৫৩)
৪. দায়বদ্ধ হওয়া অর্থে : আমি এবং ইয়াতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী তত্ত্বাবধায়ক এভাবে জান্নাত যাব-এই বলে শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুল একত্রিত করে ইশারা করে দেখালেন। (বুখারী শরীফ: ৫৩০৪)
৫. একজন মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে তার উপর জুলুম করে না, তাকে অসহায় অবস্থায় একাকী ছেড়ে দেয় না। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজনীয় রূরণে এগিয়ে আসবে মহান আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসবেন। (মুসলিম-২৫৮০)
৬. অনিশ্চয়তারপূর্ণ ঝুঁকি উত্তরণের পথ ও পদ্ধতি: নবী করীম (স:) বলেছেন-পাঁচটি বিষয়ের পূর্বে পাঁচটি বিষয়ের গুরুত্ব প্রদান করা উচিত-
১. বার্ধক্য আসার আগে যৌবনের
২. রোগাμান্ত হবার আগে সুস্থ্যতার
৩. দারিদ্র আসার আগে স্বচ্ছলতার
৪. ব্যস্ত হয়ে পড়ার আগে অবসর এবং
৫. মৃত্যু আসার আগে জীবনের
(বায়হাকী, শুআবুল ইমান-১০২৪৮, মিশকাত-৫১৭৪)
৭. হযরত আনাস বিন মালিক (রা:) বর্ণিত তিনি বলেন, এক ব্যক্তি উটের পিঠে চড়ে রাসূল (স:)-এর কাছে আসল। অতঃপর বলল: যে আল্লাহর রাসূল! আমি কি উট ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করবো না রশি দিয়ে বেঁধে? জবাবে রাসূল (স:) বললেন, আগে রশি দিয়ে উটটি বাঁধ ও সেই সাথে আল্লাহর উপর ভরসা কর। (তিরমিযী-২৫১৭)।
